'মজার ইশকুলে'র মেঘ কি দূর হলো ?
সাহাদাত হোসেন পরশ
'ম্যাডাম, ঈদের দিন কিছু খাইলেন? নাকি শুধু ঘুমিয়ে ছিলেন? আপনাকে জেলখানায় গোসল করতে দিয়েছে? স্যার, আপনার শার্ট ছিঁড়া! পুলিশ পিটিয়ে আপনার শার্ট ছিঁড়ে দিয়েছে?' হাসানের বয়স মাত্র ৬ বছর। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে 'কুমিল্লা বস্তি'তে অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন পরিচালিত 'মজার ইশকুলে' পড়ে সে। ওই স্কুলের অন্যতম দুই স্বপ্নসারথি আরিফুর রহমান ও জাকিয়া সুলতানা। শিশু পাচারের মিথ্যা অভিযোগে এক মাস আট দিন কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়ে মঙ্গলবার দুপুরে 'মজার ইশকুলে' পেঁৗছলে শিশু হাসানের কোমল মুখ থেকে প্রথমেই এমন সব প্রশ্ন ওঠে। আরিফুর ও জাকিয়াকে কেন্দ্র করে সাংবাদিকদের ক্যামেরার ফ্ল্যাশ যখন ব্যস্ত, তখন ছোট্ট হাসানের চোখ গিয়ে পড়ল ছেঁড়া শার্টের ওপর। ওর মনে জাগল অদ্ভুত এক প্রশ্ন। প্রতি বছর ঈদে যে জাকিয়া বাসা থেকে ভালো খাবার তৈরি করে মজার ইশকুলে গিয়ে সব শিশুকে মায়ের মমতায় খাইয়ে দিতেন, গত ঈদুল আজহায় সেই মানুষটির অকৃত্রিম ভালোবাসা থেকে বঞ্চিত হয় হাসান। হয়তো তাই -জাকিয়াকে দেখে শিশুটির কোমল হৃদয় থেকে এমন প্রশ্নই বেরিয়ে এলো ।
শিশু পাচারের মিথ্যা অভিযোগে গ্রেফতারের পর চার অদম্য তরুণ-তরুণী যেন মুদ্রার 'এপিঠ-ওপিঠ' দেখলেন। তারা যেমন রামপুরা থানার এসআই জিয়ারতের নিষ্ঠুরতার সাক্ষী হয়েছেন, তেমনি পেলেন চেনা-অচেনা অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা। গতকাল সমকালের কাছে আরিফুর ও জাকিয়া সেই মিশ্র অভিজ্ঞতার বিস্তারিত বর্ণনা দেন। তবে মানুষের কাছ থেকে পাওয়া ভালোবাসা ও শিশুদের মুখগুলো দেখে তারা এসআই জিয়ারতের নিষ্ঠুরতা ভুলে নয়া উদ্যমে এগিয়ে যেতে চান। বস্তিতে শিশুদের কোলাহল দেখে এও মনে হলো_ চার তরুণ-তরুণীর এমন ফেরার মধ্য দিয়ে মজার ইশকুল ঘিরে জমে থাকা অনিশ্চয়তার মেঘ কাটল।
গত ১২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর বনশ্রীর 'সি' ব্লকের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে ১০ শিশুকে উদ্ধার করে পুলিশ। ওই সময় অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের আরিফুর রহমান, জাকিয়া সুলতানা, ফিরোজ আলম খান ও হাসিবুল হাসানকে শিশু পাচারকারী সন্দেহে গ্রেফতার করা হয়। এর পর তাদের রিমান্ডে নিয়েও জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মিথ্যা অভিযোগে চার তরুণ-তরুণীকে গ্রেফতার করায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। তদন্তের পর ফাইনাল রিপোর্ট দিলে সোমবার তারা জামিনে মুক্তি পান।
সূত্র জানায়, মানব পাচারকারী হিসেবে চার তরুণ-তরুণীকে আটকের পর প্রমাণ করা সম্ভব হলে বাহিনীর সর্বোচ্চ পদক (বিপিএম-পিপিএম) পাওয়া যাবে_ এমন আশায় এসআই জিয়ারত অতি উৎসাহী ভূমিকা পালন করেছেন।
ডিএমপির ডিসি (মিডিয়া) মুনতাসিরুল ইসলাম বলেন, তদন্তের পর এসআই জিয়ারতকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়।
আগারগাঁওয়ের প্রবীণ হাসপাতালের উল্টো দিকে 'কুমিল্লা বস্তি'। আইডিবি ভবন থেকে দূরত্ব অন্তত ৫০০ গজ। আরিফুর ও জাকিয়া 'মজার ইশকুলে' যাবেন_ এমন খবরে মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের মূল সড়কে অপেক্ষমাণ অন্তত ২৫ শিশু। সবার বয়স ১২ বছরের নিচে। ওদের পিঠে স্কুলব্যাগ। রাস্তায় হঠাৎ জাকিয়াকে দেখে সবাই এগিয়ে গেল। দৌড়ে তাকে কেউ কেউ জড়িয়ে ধরল। দু'জন উঠে পড়ল তার কোলে। তরুণীর দু'চোখে তখন অশ্রু। মাতৃস্নেহের বন্ধন আগলে শিশুদের নিয়ে জাকিয়া পেঁৗছলেন 'মজার ইশকুলে'।
অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আরিফুর রহমান জানান, ২০১৩ সালের এপ্রিল থেকে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার মাধ্যমে সমাজের মূল ধারায় ফেরাতে তারা রাজধানীর শাহবাগ, সদরঘাট, কমলাপুর ও আগারগাঁওয়ে কাজ শুরু করেন। তাদের প্রতিষ্ঠানের স্বেচ্ছাসেবকদের মাসিক চাঁদা ও কয়েকজন ডোনারের মাধ্যমে তারা শিশুদের পড়ালেখার খরচ জোগাতেন। ৫০ শিশুকে পড়ালেখার পাশাপাশি শাহবাগ থানার মেসে প্রতিদিন দুপুরে খাওয়াত অদম্য বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন। এ বাবদ জনপ্রতি শিশুর জন্য শাহবাগ থানা পুলিশকে ৪০ টাকা দিতেন তারা। পরে আর্থিক সংকটের কারণে তাদের শাহবাগের উদ্যোগ গুটিয়ে নেওয়া হয়। এর পর পথশিশুদের কারিগরি শিক্ষা দিতে ২০১৪ সালে তারা শুরু করেন 'প্রজেক্ট বায়ান্ন'। রামপুরায় পথশিশুদের জন্য খোলেন শেল্টার হোম। ১০ জন ডোনারের সহায়তায় সেখানে প্রাথমিকভাবে ১০ পথশিশুকে দেখভাল করা হতো। মোবারক নামের এক শিশুর স্বজনের অভিযোগ পেয়ে রামপুরা থানা পুলিশ ১২ সেপ্টেম্বর অদম্য বাংলাদেশের চারজনকে আটক করে প্রথমে থানার হাজতখানায় রাখে। দাগি আসামির মতো ছবি তোলার সময় কারণ জানতে চাইলে জিয়ারত বলেন, 'চুপ যা....রা। প্যাদানি দিলে সব বাইর অইব।' এর পর অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করে মামলার দায়েরের পর দু'দিন রিমান্ডে নেওয়া হয়।
আরিফুর রহমান আরও জানান, রিমান্ডে তাদের চোখ বেঁধে রাখা হয়েছিল। রামপুরা থানার এসআই জিয়ারত অকথ্য ভাষায় গালমন্দ শুনিয়ে অবান্তর প্রশ্ন করে মানসিক নির্যাতন করেন। পরে ঊর্ধ্বতন এক পুলিশ কর্মকর্তার হস্তক্ষেপে জিয়ারতকে মামলার তদন্ত কর্মকর্তার পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়।
জাকিয়া সুলতানা জানান, সৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে এমন পরিস্থিতির মধ্যে পড়তে হবে_ এটা কল্পনার বাইরে ছিল। মিথ্যা অভিযোগের যে আঘাত হৃদয়কে ক্ষত করেছে, তা থেকে শক্তি সঞ্চয় করে আরও ভালোভাবে সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করতে চাই।
দৈনিক সমকাল । প্রিন্ট সংস্করণ, প্রকাশ : ২১ অক্টোবর ২০১৫, ০০:৫৭:৫৪







