Pages

Tuesday, July 30, 2013

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক -বেলাল মোহাম্মদ এর মহাপ্রয়াণে স্মরন :

                                                                        
আমি জীবনে কোনদিন কোন রাজনীতি করিনি
                                          -বেলাল মোহাম্মদ




বেলাল মোহাম্মদ 
-----------------------------------------------------------------------------
(মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ ৩০শে জুলাই , ২০১৩ তারিখ ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর ৫টার  দিকে তিনি মারা যান )
---------------------------------------------------------------------------------
যাঁর একক প্রচেষ্ঠায় গড়ে উঠেছিলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, তিনি বেলাল মোহাম্মদ। বেলাল মোহাম্মদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২০ শে ফেব্রয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার মুছাপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মৌলভি মোহাম্মদ ইয়াকুব। মাতার নাম মাহমুদা খানম। ছাত্র জীবনে বেলাল মোহাম্মদ অখন্ড ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম চট্টগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৬৪ সালে দৈনিক আজাদীতে সাব-এডিটর হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং ঐ বছরই তিনি রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম, কেন্দ্রে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহোযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার মুহুর্তে যে সরকারি প্রতিষ্ঠান তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলো, তাদের প্রথম সারিতে ছিলো বাংলাদেশ বেতার। স্বাধীনতাকামী স্বদেশের মুক্তির আকাঙ্খায় ব্যাকুল একজন কবি। সর্বোপরি নিপীড়িত জনতার বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর বেলাল মোহাম্মদ। এরূপ একটি বিশেষ মুহুর্তে বেতারের ভূমিকা কী হতে পারে সেটা বুঝে নিতে তিনি কালক্ষেপন করেননি। বাংলাদেশের শোষিত এবং নিপীড়িত জনগনের বঞ্চনার ইতিহাস তরঙ্গের মাধ্যমে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে বেলাল মোহাম্মদ অবিস্মরনীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। বেলাল মোহাম্মদ একজন নিবেদিত প্রাণ-দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী, মুক্তচিন্তা, নির্লোভ, ও বিরল ব্যাক্তিত্ব। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবময় ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি সরূপ ২০১০ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।
প্রশ্ন : বেলাল ভাই, আমরা যেটা জানি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আপনি একদম শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে আপনি অন্যতম একজন। আমরা একদম শুরুর প্রেক্ষাপটটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।
উত্তর : আসলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল একটি স্বতস্ফুর্ত উদ্যোগ। আমি যেটা স্বীকার করি সেটা হচ্ছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রেরনাদায়ক। আমরা তখন সংগঠিত হয়েছিলাম সবাই, বেতার তো একা চালানো যায় না সবাই মিলে চালাতে হয়। একটা টিমের প্রয়োজন হয়। যুদ্ধের সময় তো সবাই মুক্তিবাহিনী মুক্তিবাহিনী করে চিৎকার করতো বরং আমরা প্রথম মুক্তিবাহিনীদের যুদ্ধে যাবার জন্য উৎসাহিত করতাম। সেই উদ্যোগ আমরা প্রথম নিয়েছিলাম ২৬শে মার্চ ১৯৭১। ২৬শে মার্চের কিছু আগে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সবার উদ্দেশ্যে একটি ঘোষনা দিয়েছিলেন। ২৬শে মার্চ রেডিওতে শুনলাম মার্শাল ল জারি হয়ে গেছে এবং ঢাকা ক্যাপচার হয়ে গেছে এবং রেডিও ক্যাপচার হয়ে গেছে, ওখান থেকে ওরা নিজেদের মত পরিচালনা করবে। আমি মনে করলাম ঢাকাতে রেডিও স্টেশন পরিচালনা করতে হলে ১০০ কিলোওয়াট দরকার আর চট্টগ্রামে পরিচালনা করতে হলে মাত্র ১০ কিলোয়াট দরকার।

প্রশ্ন : ২৬ শে মার্চে আপনি কি ঢাকাতে ছিলেন নাকি চট্টগ্রামে?
উত্তর : আমি তখন চট্টগ্রামেই ছিলাম। চট্টগ্রাম বেতারে চাকুরী করতাম। আমি তখন স্ক্রীপ্ট রাইটার ছিলাম। আমি সেদিন রাতেই মনে করলাম বেতারটাকে কাজে লাগাতে হবে। আমি চিন্তা করলাম বেতারটাকে চালু রাখতে হলে কি করতে হবে, কালুরঘাটেও একটা বেতার ষ্টেশন ছিল। দুটো ষ্টেশন একসঙ্গে চালু রাখা সম্ভব না। আমরা ভাবলাম কালুরঘাট ষ্টেশনটাকেই স্টাবলিষ্ট করা। তখনো চট্টগ্রাম ক্যাপচার হয়নি। ২৬শে মার্চ ৭টা ৪০ মিনিটে আমরা প্রথম প্রোগ্রাম করার সুযোগ পাই। সেই সময় আমার প্রাথমিক সহকর্মী হিসাবে আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, আব্দুল্লাহ আল ফারুক এবং কবি আব্দুস সালাম এরকম আরো কেউ কেউ ছিলো। নামকরনটা আমিই করেছি। আমার সহকর্মীর মধ্যে একজন বললো নামের আগে বিপ্লবী শব্দটা দিতে। তাই এভাবেই দাঁড়িয়ে গেল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। সেইদিনই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের একটি লিফলেট ও তারবার্তা চট্টগ্রামে এসে পৌছেছিলো আমরা সেটি প্রচার করি এবং আমার ও আমার সহকর্মীদের নাম বিভিন্নভাবে প্রচার করি। ঠিক প্রচার যখন চলছিল তখন আওয়ামী লীগের একজন নেতা হান্নান সাহেব আসলেন। আমি আগে তাকে চিনতাম না তখন পরিচয় হল। উনি এসে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন এই মর্মে একটি লিখিত ভাষন দিলেন। কবি আব্দুস সালামও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস সঞ্চয় করার জন্য একটি ভাষন দিয়েছিলেন। এসব উপযোগ্য বিষয় নিয়ে সেদিন প্রোগ্রাম চলেছিল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।

প্রশ্ন : মানে স্বাধীনতা ঘোষনা পত্রের যে লিফলেটটা আপনি পেলেন এবং এটা তো আপনার হাতে নাও আসতে পারতো কিন্তু যে কোনো কারনেই আপনার কাছে এসেছে। আসার পরে সেটি অনেকেই পাঠ করেছেন এবং এই স্বাধীনতার ঘোষনার পাঠ নিয়ে তো আমরা অনেক রকম কথা শুনেছি। এ প্রসঙ্গে একটু সংক্ষেেপ কিন্তু বিস্তারিত শুনতে চাই।
উত্তর : বেতারে অনেকেই ঘোষনা দিয়েছেন। আমাদের যদি নূন্যতম জ্ঞান থাকে এবং ইতিহাস সম্পর্কে জানি তাহলে বোঝা যাবে একটি দেশের স্বাধীনতার ঘোষনা যে কেউ দিতে পারে না। সেটা নবাব সিরাজ উদ দৌলা পতনের পর থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত এমন কোনো নেতার আবির্ভাব ঘটেনি যে, স্বাধীনতার ঘোষনা দেবে। একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া। শেখ মুজিবুরের আগে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এরকম অনেক নেতার আবির্ভাব ঘটেছে কিন্তু এরা কেউ স্বাধীনতা ঘোষনা দেয়ার পরিবেশ পাননি। আমরা এটা ভুল করি, বেতার ঘোষক আর স্বাধীনতার ঘোষককে গুলিয়ে ফেলি। বেতার ঘোষক মানে স্বাধীনতার ঘোষক নয়। স্বাধীনতার ঘোষনা সেই দিতে পারে যার প্রতি আন্তর্জাতিক লবিং থাকে। সামরিক বাহিনী অনুগত থাকে। এইসবই আমাদের বাংলাদেশের স্মরণকালে একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল। আমরা এই স্বাধীনতার ঘোষক আর বেতার ঘোষক নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। বিশেষ করে রাজনৈতিক মহল এই বিষয়ে বেশি করে সোচ্চার হয়। একজন মেজরকে যে স্বাধীনতার ঘোষক বলা হয়। জিয়াউর রহমান সাহেবকে। তিনি জিবদ্দশায় কোনদিন নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে পরিচয় দিতেন না।

প্রশ্ন : মানে তাঁর আত্মবিশ্বাসের লেবেলটা অনেক বড় ছিল।
উত্তর : হ্যাঁ। আমরা কালুরঘাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে তিনি দশ জায়গায় ভাষন দিয়েছেন। কালুরঘাটে সন্ধ্যার দিকে পৌঁছালাম ওখানে জিয়াউর রহমানের সৈন্যবাহিনী সব সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে ফেলেছে। গেটে হাত দেখিয়ে একজন হুইসেল দিল। আমাদের দুটো গাড়ি ঢুকলো। আমার সঙ্গে যারা সহকর্মী ছিল তাদের দিয়ে প্রোগ্রাম শুরু করলাম। ওরা কিছু কিছু লেখা তৈরি করেছে। আমি জিয়াউর রহমান সাহেবকে বললাম, আচ্ছা মেজর সাহেব আমরা তো এখানে সবাই মাইনর আপনিই একমাত্র মেজর, আপনি কিছু বলবেন? উনি একটু নড়েচড়ে বসলেন, এটা সম্পর্কে উনি বললেন বেলাল টোল্ড আউট অফ জোক, জিয়া সেইড বি সিরাসিলি। উনিও বলেছেন আমিও বলেছি প্রতিটি শব্দ ড্রাফট করা হয়েছে। তারপর উনি বললেন, ‘আই এম মেজর জিয়া, অন বিহ্যাভ গ্রেট লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ তিনি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক। শেষ কথা হিসাবে তিনি বলেছেন, ‘খোদা হাফিজ, জয় বাংলা।’

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রথমে হল কালুরঘাটে। এরপর স্থানান্তর হয়ে কোথায় গেল?
উত্তর : ৩০ মার্চ কালুরঘাটে বোমবিং হল এবং সেটাই ছিল বাংলাদেশের উপর সর্বপ্রথম বিমান হামলা। ওরা আমাদেরকেই সেই মূহর্তে একমাত্র এবং বড় শত্র“ বলে মনে করেছিল। পরের দিন ১০ জন আমরা ওখানে উপস্থিত হয়েছি। ওই ১০ জনই আমরা পরবর্তীতে থেকে গেয়েছিলাম। আমি, সৈয়দ আব্দুস শাকের, রাশিদুল হোসেন, আমিনুর রহমান, শারফুজ্জামান, মুস্তফা আনোয়ার, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, রেজাউল করিম চৌধুরী, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ও কাজী হাবীব উদ্দীনÑএই দশজন। এই দশজনই আমরা স্বাধীনবাংলার প্রতিষ্ঠাকর্মী। আমরা সমবেত হয়েছিলাম কালুরঘাটে এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ দিনটি পর্যন্ত আমরা ছিলাম। একটা ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারকে কেন্দ্র করে পটিয়া হয়ে ৩ এপ্রিল আমরা আগরতলা চলে যাই। এভাবে আগরতলা এবং ইন্ডিয়ান সরকারের সহায়তায় ২৪মে পর্যন্ত ষ্টেশন চালিয়েছি। এ সময় আমরা রেকর্ড করতাম এবং বিএসএফের লোকজন আমাদের হেল্প করে। ওই সময় আমরা বুঝতাম যে আমাদের লিসনিং এরিয়া অনেক সীমিত। ভালোভাবে কেউ শুনতে পায় না। পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখছি কিন্তু পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। এই দশজনই আমরা চালাচ্ছিলাম। একজন পরে যোগ দিল, সুব্রত বড়–য়া। তিনি ১৭ই এপ্রিল যোগ দিলেন। আগরতলার ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে। তাঁকে পেয়ে আমরা বললাম আমাদের একটা পাওয়ারফুল ট্রান্সমিটার দরকার, তাছাড়া আমাদের পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। আমরা যে উদ্দেশ্যে আগাতে চাচ্ছি সেটার পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। উনি উনার ভাষায় আমাদের বললেন তোমাদের মুজিবনগর সরকারকে আমরা একটা ট্রান্সমিশন দিচ্ছি তোমাদের সেটা কাজে লাগবে। ৫০ কিলোওয়াট, ওখানে আরো অনেক কর্মী এসে উপস্থিত হল। এরমধ্যে আমরা কিছু গুরুত্বপুর্ণ কাজ করেছি। তার মধ্যে একটা হলো প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের একটা বক্তৃতা, ১৭ এপ্রিল আমবাগানে যে শপথ গ্রহন হয় সেটার এবং আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের একটা বক্তৃতা প্রচার করি। এগুলো শোনা যায়নি কিন্তু আকাশবানী এগুলো শোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ২৫ শে মার্চ থেকে শুরু হয়কলকাতা থেকে ৫০ ওয়াট কিলোয়াটের ট্রান্সমিটার। তারপর থেকে সবাই অনুষ্ঠান শুনতে পেত।

প্রশ্ন : ওই সময়তো আপনারা ছিলেন। তারপরে যুক্ত হল কারা ?
উত্তর : ঢাকা থেকে আমাদের বেশ কয়েকজন সহকর্মী গেছেন, রাজশাহী থেকে গেছেন, সবাই মিলে আমরা একত্রিত হয়ে কাজ করেছি।

প্রশ্ন : আপনি কোন দায়িত্বে ছিলেন?
উত্তর : ওখানে আমরা চারজন ছিলাম প্রোগ্রাম অর্গানাইজার। এদের মধ্যে শামসুদ্দোহা চৌধুরী, আমি, আশফাকুর রহমান খান এবং মেজবাহউদ্দীন আর প্রোগ্রাম প্রডিউসার বেশ কয়েকজন ছিলেন। রেডিও ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে আমার সাথে পাঁচ জন ছিল।

প্রশ্ন : কলকাতা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তো অনেক কিছুই পেলাম। মানে নিউজ পেলাম, কথিকা পাঠ পেলাম, নাটিকা পেলাম সঙ্গীত পেলাম। সঙ্গীত তো একটা অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। কলকাতায় যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হল এবং কর্মকান্ড চললো ওই প্রেক্ষাপট এবং ওই সময়টা সম্পর্কে একটু বলবেন।
উত্তর : আসলে ওটা ছিল সরকারের মূখপত্র। তখন সম্পূর্ণরুপে সাধারন বেতারে যে রকম পলিসি থাকে। সেটাই আমরা করেছিলাম। আমি যে পিরিয়ডের কথা বলেছি সে সময় কোনো নীতিমালা ছিলো না। আমরা সম্পূর্ণ রুপে স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছি। আমরা বলতাম বঙ্গবন্ধু মানে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা মানে বঙ্গবন্ধূ। এই আমাদের ছিল আদর্শ আর কিছুই ছিল না।

প্রশ্ন : আপনি তো শেষ পর্যন্ত ছিলেন, একদম শেষ সময়ের কথা যখন বিজয় ঘনিয়ে এল, যখন সারেন্ডার করতে যাচ্ছে, সে সময়টা এবং তারপরবর্তীতে যখন বাংলাদেশ মুক্ত হলো এবং আপনি বললেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যখন বন্ধ হয়ে গেল, সেই দিনটার কথা একটু বলেন।
উত্তর : এরপরে স্বাধীন বাংলা নামটি কিন্তু পরিবর্তিত হল ৬ ডিসেম্বর। তারপর ভারত যখন আমাদের স্বীকৃতি দিয়ে দিল ওখান থেকে নাম পাল্টে হয়ে গেল বাংলাদেশ বেতার। আর কোজিং সেশনে আমরা বলতাম জয় বাংলার দ্বিতীয় ভাগ। আর নভেম্বর মাসে ইন্ডিয়ান সরকার জাতীয় সংগীত হিসাবে স্বীকৃতি দিল, আমার সোনার বাংলা। আর একদম কোজিং সেশনে প্রচার করেছি Ñ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, আমরা তখনি কোন জাতিকে সাহায্য করি যখন সে জাতি নিজেকে নিজে সাহায্য করে। এটা একেবারে শেষ দিন প্রচার হয়েছিল। আর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিন আমরা যে বাড়িতে ছিলাম, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে সেই বাড়িতে সিকিউরিটি উঠে গেল আমরা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।

প্রশ্ন : আমরা জানতে চাই একদম কোন প্রোগ্রামটা দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর যবনিকা পাঠ হল?

উত্তর : একদম শেষতম প্রোগ্রাম নিয়ে কেউ প্রশ্নও করে নাই, তাই বলার সুযোগও পাই নাই, শেষ প্রোগ্রাম হিসাবে আমি নিজে কোরআন পাঠ করেছি, দেখে দেখে গীতা পাঠ করেছি, ত্রিপিটক পাঠ করেছি, বাইবেল পাঠ করেছি। সবগুলো পর পর নিজের কন্ঠে পাঠ করেছি। তখন কোনো পাঠক নেই। আর স্বাভাবিক নিয়মে আমরা জয় বাংলা বলে শেষ করতাম।

প্রশ্ন : এবারে জানতে চাই আজকে স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হলো, এই ৪০ বছরের স্বপ্ন কতটুকু পুরন হয়েছে।
উত্তর : আমি জীবনে কোনদিন কোন রাজনীতি করিনি। আমি একজন সাধারন নাগরিক হিসাবে, একজন বেতার কর্মী হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮৬ সালে আমার একটি বই বেরিয়েছিল ‘আরেক মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ১৯৯০ সালে আমার একটি কবিতার বই বের হয়েছিল, ‘সামনে আছে মুক্তিযুদ্ধ।’ আমরা ৯ মাসে ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও কাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি নাই। আর জনগনের যে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতার যে মর্মকথা তার ধারে কাছেও আমরা যেতে পারি নাই। আরেকবার আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে অবিকল একই রকম মুক্তিযুদ্ধ। আগে আমরা শত্র“কে চিনতে পারতাম, এখন আমরা শত্র“কে চিনতে পারছি না। আমরাই আমাদের শত্র“। আরবীতে একটা কথা আছে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। আমরা এখন যে স্বাধীনতা ভোগ করছি সেটা হচ্ছে পতাকা শোভিত স্বাধীনতা আর জাতীয় সংগীত শোভিত স্বাধীনতা। আসল স্বাধীনতা পেতে হলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আরেকবার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে হবে। সেই মুক্তিযুদ্ধ হবে নিজের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন মানে স্ব-অধীন। যতদিন পর্যন্ত নিজের অধীনে আসতে পারবো না ততদিন পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবো না ।  

সাক্ষাৎকারটি উকিপিডিয়ার মাধ্যমে mediavibrationbd.com,এর সৌজন্যে ২৮-১১-২০১২ প্রকাশিত হয় । আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিবেদন করা হলো -বাংলার প্রান্তর

Monday, July 29, 2013

হাসান হাফিজুর রহমান

                                                                  হাসান হাফিজুর রহমান

Friday, July 26, 2013

   বাংলার প্রান্তর  #   ছবি ঃ সিদ্দিকুর রহমান

Thursday, July 25, 2013

আপনি কখন বুঝবেন আপনি বাংলাদেশে আছেন ?

Atanu Karanjai
যখন আপনি কোন এক অপরিচিত জায়গায় গিয়ে একজনকে ঠিকানা জিজ্ঞেস করার পর সে আপনাকে ঠিকানা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসবে - আপনি বুঝবেন আপনি বাংলাদেশে আছেন!

যখন দেখবেন একজন মানুষের বিয়েতে পাড়া-প্রতিবেশী, বন্ধু-বান্ধব সবাই এসে বিয়ের আনন্দে শামিল হচ্ছে, কেউ হলুদ-মরিচ বাটছে, কেউ প্যান্ডেল টানাচ্ছে, কেউ বরের স্যান্ডেল চুরি করে পালাচ্ছে, কেউ জোড়ে কান ফাটিয়ে গান বাজাচ্ছে, আবার মেয়ে বিদায় দেয়ার সময় এরাই আবার হাউমাউ করে গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদছে - তখন বুঝবেন আপনি বাংলাদেশে আছেন!

যখন আপনি ১৮ বছর পেড়িয়ে যাওয়া আপনার কোন প্রাপ্তবয়স্ক বন্ধুকে বলবেন আরেকটু রাত করে বাসায় যা, এখন তো বড়ই হয়ে গেছিস, সে বলবে - 'না রে দোস্ত, বাসায় দেরি করে গেলে আব্বা বকবে' -- তখন বুঝবেন আপনি বাংলাদেশে আছেন!

যখন আপনি জানবেন যে বিশ্ব র‍্যাংকিং এ সবচেয়ে খারাপ শহরে থাকা মানুষগুলো প্রতিদিনের ছোট ছোট সুখের ঘটনা মনে করে ফেইসবুকে স্ট্যাটাস দেয় , 'নাহ! লাইফ ইজ বিউটিফুল!' - তখন বুঝবেন আপনি বাংলাদেশেই আছেন!

যখন আপনি পত্রিকায় পড়বেন দূর্নীতিতে শীর্ষস্থানীয় একটি দেশের মানুষের সর্বস্ব লুটেপুটে খাচ্ছে কিছু হায়েনার দল, তারপরেও সেই দেশের মানুষেরা অনুভূতি,আদরে, ভাত ভর্তা ভাজির মধ্যে সুখ খুজে নিয়ে সবচাইতে সুখী দেশের খাতায় নাম লিখিয়েছে - আপনি শিউর থাকতে পারেন দেশটির নাম বাংলাদেশ!

আপনি নিজেকে বাঙ্গালী বলতে পারেন, বাংলাদেশী বলতে পারেন - সেটা আপনার ইচ্ছে! যেটা মূল কথা সেটা হচ্ছে আপনি অপরিচিত কারো সাথে দেখা হলে ব্রিটিশ নাগরিকদের মতো কথা শুরু করার জন্যে এইটা বলেন না, 'আজকের আবহাওয়া টা অনেক সুন্দর তাই না!'
আপনি অপরিচিত কারো সাথে কথা শুরু করার জন্যে বলেন, 'ভাই, ভালো আছেন!'
এই এক লাইনেই বোঝা যায় আপনি কতো ভালোবাসায় বড় হয়েছেন, অনেক বড় হয়ে যাবার পরেও আজো আপনাকে বাবার আদরে - রাগে মাখানো বকা খেতে হয়, ভাত খেতে না গেলে আপনার মা আপনার কানের কাছে 'ভাত খেতে আয়, ভাত খেতে আয়' বলে বলে ভাত খাইয়ে ছাড়েন!
মুদ্রার অপর পিঠ তো সব জায়গাতেই আছে! তাই বলে কি বাংলাদেশ পচে যাচ্ছে! আমরা কি পচে যাচ্ছি! মোটেই না! এত এত বহুর্মূখী শোষণের পরেও এদেশের মানুষ এতো সুন্দর করে বেঁচে আছে, তার কারণ একটাই, আমরা মায়ায় বড় হই, ভালোবাসায় বড় হই, আমরা আদরে বাঁচি, আপনজনের খেয়ালে, রাগে, হাসি, কান্নায় দিন কাটাই!

ইবনে বতুতা ভারত উপমহাদেশ ভ্রমনের সময় একটা বিশেষ অঞ্চলকে স্বর্গের মতো সুন্দর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। সে অঞ্চলটার নাম এখন বাংলাদেশ!
আমরা বাঙ্গালীরা জাতি হিসেবে বড়ই অনুভূতিপ্রবণ - দিনশেষে ঘরের কোণে ছয় ফিট লম্বা, তিন ফিট চওড়া বিছানাটাকেই আমরা স্বর্গ ভাবি আমরা জানি কিভাবে আনন্দে বাঁচতে হয়!
 
                                          Atanu Karanjai.
 

Friday, July 19, 2013







                                                             মায়ের বুকেই ছেলের কবর
                                      হাসান আরিফ , সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট

হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুকে ঘিরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সংঘটিত রূপের একটা মহড়া হয়ে গেল। পরিবারের মত পেলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দেশের সকল বরেণ্য মানুষকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যেতে চাই।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের উন্মেষ লগ্নে ভাষার অধিকার পাবার স্মারক। তাই এ দেশ ও জাতি এগিয়ে যেতে, যে মানুষেরা অবদান রেখেছেন সেই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়েই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধায় অবনত হই। হুমায়ূন আহমেদ দেশপ্রেমিক হিসেবে আমাদের সব শর্ত পূরণ করেন। তাই আমরা তার প্রয়াণের সংবাদ পাবার পরপরই শহীদ মিনারে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। অপেক্ষা পরিবারের সম্মতি পাবার, তা মিলে গেল। সংগত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা ও পরিবারের মতের কোনো অমিল ঘটল না।

(মরদেহ শহীদ মিনারে নির্ধারিত স্থানে রাখা হলো। শোকার্ত সন্তান ও ভাই বোনেরা কফিনের পেছনে দাঁড়ালেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মানুষের ভালোবাসার শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করার জন্য। মাইকে যত দূর সম্ভব হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকলের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর হুমায়ূন আহমেদের মা এসে ছেলের কফিন আঁকড়ে দাঁড়ালেন)

এই প্রথমবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম। এই ভাবনার কারণগুলো হচ্ছেÑ
১. সঠিক সময়ে হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছাবে কি না
২. বিমানবন্দর থেকে শহীদ মিনার পৌঁছানোটা নির্বিঘœ হবে কি না
৩. শহীদ মিনারে কত মানুষ হবে
৪. সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন মাধ্যম, সংবাদপত্র সর্বস্তরের মানুষ সবাইকে সমান প্রাধান্য দিয়ে সবার প্রিয় মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নিশ্চিত করা
৫. শ্রাবণ মাস বৃষ্টি হতেই পারে, তা যেন শ্রদ্ধা নিবেদন স্বাভাবিকতা ও স্বাবলীলতা ক্ষুণœ না করে।
এ নিয়ে ২০ জুলাই থেকে জোট নেতৃবৃন্দ, পরিবারের সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলে চলেছি। চূড়ান্তভাবে ২২ জুলাই সকালবেলায় সংশ্লিষ্ট সবাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি সমন্বিত সভায় মিলিত হলাম।
শহীদ মিনারে একুশে ফেব্র“য়ারিকে কেন্দ্র করে যে রকম নিরাপত্তাবেষ্টনী ব্যবস্থা করা হয়, অনেকটা সেই আদলেই বিষয়টা ভাবা হলো, ব্যতিক্রম শুধু শহীদ মিনারে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। স্থির করা হলো দোয়েল চত্বরের দিক থেকে এসে সকলে প্রবেশ করবে এবং জগন্নাথ হলের দিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে।
সকাল থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বেষ্টনীর কাজ শুরু হলো। দিনশেষে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য মনে হলো। সকল সরকারি বেসরকারি টেলিভিশনের কলাকুশলী, সংবাদপত্রের আলোকচিত্র সাংবাদিকÑ সকলে শহীদ মিনারে উপস্থিত। কাল হুমায়ূন আহমেদের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব কীভাবে সম্প্রচার করা হবে, তারই আয়োজন হচ্ছে। নানা যন্ত্রপাতি আসছে। টেবিলে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের নাম লিখে জায়গা নির্ধারণ করে রাখার চেষ্টা আর ফটোসাংবাদিকেরাও দেখে নিচ্ছেন তাদের ব্যবস্থা কী হলো। আর সব ব্যস্ততার মাঝে একে অপরের সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে মতপ্রকাশ ও ভাবনাÑ শহীদ মিনারে কত লোক হবে।
ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা অতিক্রম করার পর যখন শহীদ মিনার ত্যাগ করছি পেছনের ফিরে শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, গণমাধ্যমের হাট বসেছে শহীদ মিনার চত্বরে। সকলের সেই কৌতূহলটা মাথা থেকে কোনোভাবেই বের করতে পারছি না, কাল শহীদ মিনারে কত লোক হবে?
সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভোর ছয়টায় শহীদ মিনারে প্রবেশ করবার কথা, তখনই স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হবে এবং নির্ধারিত স্বেচ্ছাসেবক ব্যাজ প্রদান করা হবে।
ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর ছটা স্পর্শ করেছে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি এমন সময় মঞ্জুর ফোন, ‘বেশ ক’টি টেলিভিশন ক্যামেরা নির্ধারিত স্থানের বাইরে এসে স্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে কী করব?’ আমি বললাম, সকলেই জানে, কার জন্য কোন জায়গা নির্ধারিত, তুমি বিষয়টি স্মরণ করিয়ে অনুরোধ করো, নিশ্চয়ই তারা সরে যাবে। অল্প সময়ের মধ্যে আমি শহীদ মিনারে পৌঁছে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সর্বাÍকভাবে প্রস্তুত, তবে সবাইকে নির্ধারিত স্থানে রাখতে জোট কর্মীদের খুব বেগ হচ্ছিল। তখনই লালনের একটা গান মনে এসেছিল,
‘চিরদিন ইচ্ছা মনের
আল ডিঙ্গাইয়া ঘাষ খাবা
মন সহজেই সই হবো।’
১১টায় হুমায়ূন আহমেদের শবদেহ আসবে। হঠাৎ সাড়ে ৯টায় বলা হলো ১০টার মধ্যেই তার মরদেহ শহীদ মিনারে আসবে। আমরা প্রস্তুত। ইতোমধ্যে প্রবেশস্থলেই প্রচুর লোক সমাগম ঘটেছে। শহীদ মিনার থেকে বেরোতে পারছি না বলে সবটা দৃষ্টিগোচরে আনা সম্ভব নয়।
মরদেহ শহীদ মিনারে নির্ধারিত স্থানে রাখা হলো। শোকার্ত সন্তান ও ভাই বোনেরা কফিনের পেছনে দাঁড়ালেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মানুষের ভালোবাসার শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করার জন্য। মাইকে যত দূর সম্ভব হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকলের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর হুমায়ূন আহমেদের মা এসে ছেলের কফিন আঁকড়ে দাঁড়ালেন। শহীদ মিনারে দেশের কত কৃতী সন্তানদের শেষ শ্রদ্ধা জানানো হলো, চৌষট্টি বছরের মৃত সন্তানকে আঁকড়ে আছেন শুভ্র সারির এক বর্ষীয়ান মা। দেখে মনে হয় তার চোখ থেকে পুত্র শোকের অশ্র“ নয়, যেন এক অনন্য নদী প্রবাহিত হচ্ছে। একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যিনি তার জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে সন্তানদের বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন, স্বাধীন দেশে এই শহীদ সন্তানদের তিনিই ছিলেন প্রগাঢ় ছায়া। আজ তার বড় সন্তান নিশ্চুপ নিথর হয়ে আছে। তাকে ঘিরে হাজারো মানুষ শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর মাতম। তার সন্তানেরা স্বাধীনতার চার দশকে কৃতী মানুষ হয়েছেন এমনকি দৌহিত্ররা ও অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। সবাই তার পাশে তবু তিনি যেন কারও সঙ্গে সন্তান হারানোর শোক ভাগ করে নিতে ব্যর্থ।
একসময় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় শেষ হয়ে গেল। পুষ্পস্নাত হুমায়ূন আহমেদকে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। প্রয়াত ছেলের মুখ দেখে তবেই বাড়ি যাবেন আজ। জানাজা শেষে ছেলে মেয়ে নাতি-নাতনিদের নিয়ে যাবেন বারডেম হাসপাতালে, সেই মতো তিনিও গেলেন।
শক্ত শর্তজুড়ে প্রিয় সন্তানের নিথর নিশ্চল নিশ্চুপ মুখ দর্শন করলেন। হু হু করে কেঁদে উঠলেন। শর্ত পালনের ফলে মৃত সন্তানের মুখ দর্শনের শোক সংবাদ হয়ে ওঠার সুযোগ হয়ে উঠল না। অথবা ভিন্নভাবে বলি, মা তার প্রিয় সন্তানের জন্য হাহাকারকে দেশের করতে দিলেন না।
তবু আমরা অপারগ হলাম বুঝতে, মানুষের একান্ত বলে কিছু থাকে। যেমন ধর্ম বলে ‘মায়ের পায়ের নিচে
সন্তানের বেহেস্ত’। ফলে মা কি তার ছেলেকে হারায় কোনো দিন?
তবু জগৎ সংসারে এমনটাও ঘটে শত কোলাহলে। আমরা মায়ের মতো জানতে ভুলে যাই, ভুলে যাই মৃত্যুসংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের বুকে সন্তানের কবর রচিত হয়ে যায়।
কোলাহল থেমে গেলে মা যখন বলেন, ‘ছেলের কবর তো আমার বুকেই।’
লজ্জায় বোধসম্পন্ন মানুষদের মাথা নিচু হয়ে যায়। আমরা তো সেই জাতি, যারা মা ও মাতৃভূমিকে সমার্থক বলে জানি। সংশয় কাটে না, আমরা কি মায়ের প্রতি কোনো অবহেলা করে ফেললাম।
 

Posted on August 8, 2012
Shapthaik Kagoj

Tuesday, July 16, 2013


 
একাত্তরের একটি ছেলে //
একাত্তরের একটি ছেলে
মুক্তিযুদ্ধে গেলো,
যুদ্ধ শেষে ডিসেম্বরে
সবাই ফিরে এল।
ফিরলো নাতো সেই ছেলেটি
মায়ের বুক খালি,
চারদিকেতে ছড়িয়ে আছে
রক্তভেজা বালি।
বাবাও তার হারিয়ে গেছে
শাপলা বিলের তলে,
বোনের দেহ ভেসে গেছে
কবেই নদীর জলে।
বুলেট লাগা বুকের খুনে
লিখেছে সেই ছেলে,
যুদ্ধ আজো হয়নিরে শেষ
দিতে হবে আরো রক্ত ঢেলে।
মিলিটারির পায়ের দাগে
উজাড় ঘরবাড়ি,
মূত্যু যেন জীবন নিয়ে
খেলছ কাড়াকাড়ি।
সেই ছেলেটির ডাক শুনেছি
বলছে ওরে রুখ
যেদিন হবে শোষন শাষন
যেদিন হবে শেষ
সেদিন আমি ফিরবো ঘরে
স্বাধীন বাংলাদেশ ।।
 কবিতা :সংগ্রহিত

Monday, July 15, 2013

 
 দিকশূন্যপূরের আমি  ?
রুমা মোদক
আমরা বাঙালি । আমরা গাধার দল। ঠিক যেমন ৫ই ফেব্রুয়ারীতে ছুটে গেছিলাম শাহবাগে ঠিক তেমনি আরও ৪২ বছর আগে আমাদেরই চাচা মামারা ছুটে গিয়েছিলেন যুদ্ধে। একই ভাবে। একই রকম মানসিকতা থেকে। উনাদের এই আত্মত্যাগের ফল কি হল তা আমরা দেখতেই পাচ্ছি। কালকেই এই ইস্যু আমরা ভুলে যাব। আমাদের মত বেহায়া, গন্ডারের চামড়া ওয়ালা জাত খুব কমই আছে। হতেই পারে। বৃটিশদের জুতা পোঁছা জাত আমরা। ২০০ বছর লেগেছে সেই তলা থেকে উঠতে। দিন গেছে, আমাদের সহ্যশক্তিও বেড়েছে। এই দফা মাথা তুলে দাঁড়াতে ৪০০ বছরও লেগে যেতে পারে। ছুপা বেঈমানের চেয়ে ডাইরেক্ট বেঈমান ভালো। ডাইরেক্ট বেঈমানের একটা নীতি আছে- সে পেছন থেকে ছুরি মেরে মাটিতে ফেলে পাড়াবে। ছুপা বেঈমান পেছন থেকে ছুরি মারতে মারতেও বলবে ওহ গড ওহ গড এ আমি কি করছি? শিট! হাত ফসকে গেল। ডাক্তার! এ্যাম্বুলেন্স! জড়িয়ে ধরতে গিয়ে ক্ষতস্থানে চিপ দিয়ে শরীরের বাকী রক্তগুলিও ফেলে দিবে। আমাদের চারপাশে সব ছুপা রাজাকার। কারণ রাজাকারিটা খুব লাভজনক ছিল। মানুষের সম্পদ দখল, এর মাথা মাড়িয়ে অনৈতিকভাবে এগিয়ে যাওয়া, ডিগ্রী পাওয়া সব কিছু সম্ভব। আমরা কিছু বেকুব আজও মনের মাঝে দেশপ্রেম নিয়ে বেঁচে আছি যাদের পরিণতি মানুষের হাসি ঠাট্টা, শিবিরের পোঁচানো, সরকারের গ্রেফতারী পরোয়ানার আতঙ্ক নিয়ে বাস করা। সব জায়গায় আমরা পিছিয়ে। কারণ আমরা রাজাকারি করিনি। আজকে সেই পথে হাঁটলে দুঃখ পেতে হতনা। আজকের দিনটা হতে পারত অলস ডেটিং এর দিবস। কিংবা ফুল ভল্যিউমে গান শোনার একাকী দুপুর। অথচ আজকে আমরা পরাজিত, দুঃখিত মনে বাসায় বসে আছি। কেউবা শাহবাগে। আমাদের আসলেই কি করার আছে? অন্যায় খুনের সাজা হয়না। আমাদের সাজা হবে। আমরা যা করব তাতেই পৃথিবীর সকল বিধিমালা উড়ে আসবে আমাদের সর্বোচ্চ শাস্তি দেবার জন্য। কারণ এই দেশটা মগের মুল্লুক। এই দেশটা ভরে গেছে বেঈমানে। লক্ষ শহীদ থেকে শুরু করে একজন দুজন করে অনেকে প্রাণ দিয়েছে। কিছু লাভ হয়নি। হবেও না। সময় এসেছে নিজের আখের গোছানোর। ভুলে যাবো এই দেশ আমার। হ্যাঁ, আমি পরাজিত। গর্তেই আমার বাস অথবা দেশের মাটিতে বেঈমান হয়ে বুক ফুলিয়ে বাঁচাই উপায়। অথবা দেশান্তরী। যে যেটা বেছে নেবে ।
 

Saturday, July 13, 2013


 
মুক্তিযোদ্ধাদের নূতন প্রজন্মের মুখোমুখি দাড় করাবেন না 
নাসির উদ্দিন ইউসুফ
বীরমুক্তিযোদ্ধা
আমরা মুক্তিযোদ্ধারা অত্যান্ত অসশ্তিকর পরিস্থিতিতে এবং মনবেদানায় সময় আতিবাহিত করছি। মুক্তিযোদ্ধারা বাংলাদেশ স্বাধীন করবার জন্য এবং জনগণের মুক্তির জন্য পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাছিলো। কোন পুরস্কার এর জন্য নয়। জনগনের চাইতে বেশী সুযোগ পাওয়ার জন্য নয়। কোটার জন্য নয়। কোটা আমাদের জন্য কোন পুরস্কার নয়। জনগনে্র ভালোবাসা আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় পুরস্কার। “স্বাধীন বাংলাদেশ” সবচেয়ে বড় পুরস্কার। আমরা মুক্তিযোদ্ধারা ভাড়াটিয়া যোদ্ধা নই, দেশপ্রেমিক যোদ্ধা । ৩০লাখ মানুষের জীবন আর ৩ লাখ নারীর সমভ্রম এর বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীন বাংলাদেশ আমাদের সকল সন্তানদের জন্য। নতুন প্রজন্মের জন্য। মুক্তিযোদ্ধা-অমুক্তিযোদ্ধা বিভাজন নয় । সকলের সমান অধিকার চাই। ৪২ বছর পর মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য কোটা রাখার কোন যুক্তি নাই। প্রায় সকল যোদ্ধার সন্তানদের বয়স অতিক্রান্ত। চাকুরি বিহীন দরিদ্র জীবন যাপন করছে। সে খবর কে রাখে না মানুষ, না রাষ্ট্র!! যদি কোন মুক্তিযোদ্ধার সন্তান এখনো চাকুরি বিহীন থাকে তবে তাকে বিশেষ ব্যবস্থায় চাকুরী দেয়া যায় । মুক্তিযোদ্ধার দোহিত্র এর জন্য কোটা আমি সমরথন করতে পারিনা। শহীদ পরিবারের সদস্য দের জন্য, নারীদের জন্য,আদিবাসিদের জন্য সল্প কোটা রাখা উচিত, তবে তা সবমিলিয়ে ২০% এর বেশী নয়। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী রাজাকার - আলবদর বা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অনুসারিদের বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস এ নিষিদ্ধ দেখতে চাই।

সকল রাজনিতিবিদ, বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তার কাছে আমার অনুরোধ মুক্তিযোদ্ধাদের নূতন প্রজন্মের মুখোমুখি দাড় করাবেন না । ওরা আমাদের সন্তান। ওদের সম অধিকার আছে এই দেশে। তবে যারা আন্দলনের নামে ১লা বৈশাখ এর মঙ্গল শোভাযাত্রার উপকরণে আগুন দিয়েছে, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে কটূক্তি করার দুঃসাহস দেখিয়েছে তাদের অপরাধ ক্ষমার অযোগ্য । তাদের শাস্তি দাবি করছি। তারা বাঙালি সংস্ক্রিতি, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী রাজাকারদের সন্তান।

আমরা মুক্তিযোদ্ধা, আমরা সকল মানুষের সমধিকার, গনতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষ বাংলাদেশে বিশ্বাস করি।
জয় বাংলা ।
 তথ্যসূত্র  : https://www.facebook.com/messages/nasiruddin.yousuff.5