Pages

Tuesday, July 30, 2013

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক -বেলাল মোহাম্মদ এর মহাপ্রয়াণে স্মরন :

                                                                        
আমি জীবনে কোনদিন কোন রাজনীতি করিনি
                                          -বেলাল মোহাম্মদ




বেলাল মোহাম্মদ 
-----------------------------------------------------------------------------
(মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক বেলাল মোহাম্মদ ৩০শে জুলাই , ২০১৩ তারিখ ৭৭ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। ঢাকার অ্যাপোলো হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ)
চিকিৎসাধীন অবস্থায় ভোর ৫টার  দিকে তিনি মারা যান )
---------------------------------------------------------------------------------
যাঁর একক প্রচেষ্ঠায় গড়ে উঠেছিলো স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র, তিনি বেলাল মোহাম্মদ। বেলাল মোহাম্মদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ২০ শে ফেব্রয়ারি চট্টগ্রাম জেলার সন্দ্বীপ থানার মুছাপুর গ্রামে। তার পিতার নাম মৌলভি মোহাম্মদ ইয়াকুব। মাতার নাম মাহমুদা খানম। ছাত্র জীবনে বেলাল মোহাম্মদ অখন্ড ছাত্র ইউনিয়নের প্রথম চট্টগ্রাম কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি ১৯৬৪ সালে দৈনিক আজাদীতে সাব-এডিটর হিসেবে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন এবং ঐ বছরই তিনি রেডিও পাকিস্তান চট্টগ্রাম, কেন্দ্রে যোগ দেন। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অসহোযোগ আন্দোলনের ডাক দেওয়ার মুহুর্তে যে সরকারি প্রতিষ্ঠান তার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলো, তাদের প্রথম সারিতে ছিলো বাংলাদেশ বেতার। স্বাধীনতাকামী স্বদেশের মুক্তির আকাঙ্খায় ব্যাকুল একজন কবি। সর্বোপরি নিপীড়িত জনতার বঞ্চনার বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর বেলাল মোহাম্মদ। এরূপ একটি বিশেষ মুহুর্তে বেতারের ভূমিকা কী হতে পারে সেটা বুঝে নিতে তিনি কালক্ষেপন করেননি। বাংলাদেশের শোষিত এবং নিপীড়িত জনগনের বঞ্চনার ইতিহাস তরঙ্গের মাধ্যমে দেশের একপ্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছড়িয়ে দিতে বেলাল মোহাম্মদ অবিস্মরনীয় ভূমিকা রেখেছিলেন। বেলাল মোহাম্মদ একজন নিবেদিত প্রাণ-দেশপ্রেমিক, মানবতাবাদী, মুক্তচিন্তা, নির্লোভ, ও বিরল ব্যাক্তিত্ব। স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধে তাঁর গৌরবময় ও কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি সরূপ ২০১০ সালে তিনি স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত হন।
প্রশ্ন : বেলাল ভাই, আমরা যেটা জানি স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে আপনি একদম শুরু থেকে যুক্ত ছিলেন এবং প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে আপনি অন্যতম একজন। আমরা একদম শুরুর প্রেক্ষাপটটা আপনার মুখ থেকে শুনতে চাই।
উত্তর : আসলে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল একটি স্বতস্ফুর্ত উদ্যোগ। আমি যেটা স্বীকার করি সেটা হচ্ছে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র আমাদের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান প্রেরনাদায়ক। আমরা তখন সংগঠিত হয়েছিলাম সবাই, বেতার তো একা চালানো যায় না সবাই মিলে চালাতে হয়। একটা টিমের প্রয়োজন হয়। যুদ্ধের সময় তো সবাই মুক্তিবাহিনী মুক্তিবাহিনী করে চিৎকার করতো বরং আমরা প্রথম মুক্তিবাহিনীদের যুদ্ধে যাবার জন্য উৎসাহিত করতাম। সেই উদ্যোগ আমরা প্রথম নিয়েছিলাম ২৬শে মার্চ ১৯৭১। ২৬শে মার্চের কিছু আগে ৭ই মার্চ বঙ্গবন্ধু সবার উদ্দেশ্যে একটি ঘোষনা দিয়েছিলেন। ২৬শে মার্চ রেডিওতে শুনলাম মার্শাল ল জারি হয়ে গেছে এবং ঢাকা ক্যাপচার হয়ে গেছে এবং রেডিও ক্যাপচার হয়ে গেছে, ওখান থেকে ওরা নিজেদের মত পরিচালনা করবে। আমি মনে করলাম ঢাকাতে রেডিও স্টেশন পরিচালনা করতে হলে ১০০ কিলোওয়াট দরকার আর চট্টগ্রামে পরিচালনা করতে হলে মাত্র ১০ কিলোয়াট দরকার।

প্রশ্ন : ২৬ শে মার্চে আপনি কি ঢাকাতে ছিলেন নাকি চট্টগ্রামে?
উত্তর : আমি তখন চট্টগ্রামেই ছিলাম। চট্টগ্রাম বেতারে চাকুরী করতাম। আমি তখন স্ক্রীপ্ট রাইটার ছিলাম। আমি সেদিন রাতেই মনে করলাম বেতারটাকে কাজে লাগাতে হবে। আমি চিন্তা করলাম বেতারটাকে চালু রাখতে হলে কি করতে হবে, কালুরঘাটেও একটা বেতার ষ্টেশন ছিল। দুটো ষ্টেশন একসঙ্গে চালু রাখা সম্ভব না। আমরা ভাবলাম কালুরঘাট ষ্টেশনটাকেই স্টাবলিষ্ট করা। তখনো চট্টগ্রাম ক্যাপচার হয়নি। ২৬শে মার্চ ৭টা ৪০ মিনিটে আমরা প্রথম প্রোগ্রাম করার সুযোগ পাই। সেই সময় আমার প্রাথমিক সহকর্মী হিসাবে আবুল কাসেম সন্দ্বীপ, আব্দুল্লাহ আল ফারুক এবং কবি আব্দুস সালাম এরকম আরো কেউ কেউ ছিলো। নামকরনটা আমিই করেছি। আমার সহকর্মীর মধ্যে একজন বললো নামের আগে বিপ্লবী শব্দটা দিতে। তাই এভাবেই দাঁড়িয়ে গেল স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতার কেন্দ্র। সেইদিনই বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ভাষনের একটি লিফলেট ও তারবার্তা চট্টগ্রামে এসে পৌছেছিলো আমরা সেটি প্রচার করি এবং আমার ও আমার সহকর্মীদের নাম বিভিন্নভাবে প্রচার করি। ঠিক প্রচার যখন চলছিল তখন আওয়ামী লীগের একজন নেতা হান্নান সাহেব আসলেন। আমি আগে তাকে চিনতাম না তখন পরিচয় হল। উনি এসে বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীনতার ঘোষনা দিয়েছেন এই মর্মে একটি লিখিত ভাষন দিলেন। কবি আব্দুস সালামও মুক্তিযোদ্ধাদের সাহস সঞ্চয় করার জন্য একটি ভাষন দিয়েছিলেন। এসব উপযোগ্য বিষয় নিয়ে সেদিন প্রোগ্রাম চলেছিল সাড়ে ৯টা পর্যন্ত।

প্রশ্ন : মানে স্বাধীনতা ঘোষনা পত্রের যে লিফলেটটা আপনি পেলেন এবং এটা তো আপনার হাতে নাও আসতে পারতো কিন্তু যে কোনো কারনেই আপনার কাছে এসেছে। আসার পরে সেটি অনেকেই পাঠ করেছেন এবং এই স্বাধীনতার ঘোষনার পাঠ নিয়ে তো আমরা অনেক রকম কথা শুনেছি। এ প্রসঙ্গে একটু সংক্ষেেপ কিন্তু বিস্তারিত শুনতে চাই।
উত্তর : বেতারে অনেকেই ঘোষনা দিয়েছেন। আমাদের যদি নূন্যতম জ্ঞান থাকে এবং ইতিহাস সম্পর্কে জানি তাহলে বোঝা যাবে একটি দেশের স্বাধীনতার ঘোষনা যে কেউ দিতে পারে না। সেটা নবাব সিরাজ উদ দৌলা পতনের পর থেকে আমাদের কাল পর্যন্ত এমন কোনো নেতার আবির্ভাব ঘটেনি যে, স্বাধীনতার ঘোষনা দেবে। একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমান ছাড়া। শেখ মুজিবুরের আগে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এরকম অনেক নেতার আবির্ভাব ঘটেছে কিন্তু এরা কেউ স্বাধীনতা ঘোষনা দেয়ার পরিবেশ পাননি। আমরা এটা ভুল করি, বেতার ঘোষক আর স্বাধীনতার ঘোষককে গুলিয়ে ফেলি। বেতার ঘোষক মানে স্বাধীনতার ঘোষক নয়। স্বাধীনতার ঘোষনা সেই দিতে পারে যার প্রতি আন্তর্জাতিক লবিং থাকে। সামরিক বাহিনী অনুগত থাকে। এইসবই আমাদের বাংলাদেশের স্মরণকালে একমাত্র শেখ মুজিবুর রহমানের ছিল। আমরা এই স্বাধীনতার ঘোষক আর বেতার ঘোষক নিয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলি। বিশেষ করে রাজনৈতিক মহল এই বিষয়ে বেশি করে সোচ্চার হয়। একজন মেজরকে যে স্বাধীনতার ঘোষক বলা হয়। জিয়াউর রহমান সাহেবকে। তিনি জিবদ্দশায় কোনদিন নিজেকে স্বাধীনতার ঘোষক বলে পরিচয় দিতেন না।

প্রশ্ন : মানে তাঁর আত্মবিশ্বাসের লেবেলটা অনেক বড় ছিল।
উত্তর : হ্যাঁ। আমরা কালুরঘাট পৌঁছাতে পৌঁছাতে তিনি দশ জায়গায় ভাষন দিয়েছেন। কালুরঘাটে সন্ধ্যার দিকে পৌঁছালাম ওখানে জিয়াউর রহমানের সৈন্যবাহিনী সব সিকিউরিটির ব্যবস্থা করে ফেলেছে। গেটে হাত দেখিয়ে একজন হুইসেল দিল। আমাদের দুটো গাড়ি ঢুকলো। আমার সঙ্গে যারা সহকর্মী ছিল তাদের দিয়ে প্রোগ্রাম শুরু করলাম। ওরা কিছু কিছু লেখা তৈরি করেছে। আমি জিয়াউর রহমান সাহেবকে বললাম, আচ্ছা মেজর সাহেব আমরা তো এখানে সবাই মাইনর আপনিই একমাত্র মেজর, আপনি কিছু বলবেন? উনি একটু নড়েচড়ে বসলেন, এটা সম্পর্কে উনি বললেন বেলাল টোল্ড আউট অফ জোক, জিয়া সেইড বি সিরাসিলি। উনিও বলেছেন আমিও বলেছি প্রতিটি শব্দ ড্রাফট করা হয়েছে। তারপর উনি বললেন, ‘আই এম মেজর জিয়া, অন বিহ্যাভ গ্রেট লিডার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।’ তিনি আমাদের স্বাধীনতার ঘোষক। শেষ কথা হিসাবে তিনি বলেছেন, ‘খোদা হাফিজ, জয় বাংলা।’

প্রশ্ন : স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র প্রথমে হল কালুরঘাটে। এরপর স্থানান্তর হয়ে কোথায় গেল?
উত্তর : ৩০ মার্চ কালুরঘাটে বোমবিং হল এবং সেটাই ছিল বাংলাদেশের উপর সর্বপ্রথম বিমান হামলা। ওরা আমাদেরকেই সেই মূহর্তে একমাত্র এবং বড় শত্র“ বলে মনে করেছিল। পরের দিন ১০ জন আমরা ওখানে উপস্থিত হয়েছি। ওই ১০ জনই আমরা পরবর্তীতে থেকে গেয়েছিলাম। আমি, সৈয়দ আব্দুস শাকের, রাশিদুল হোসেন, আমিনুর রহমান, শারফুজ্জামান, মুস্তফা আনোয়ার, আব্দুল্লাহ আল ফারুক, রেজাউল করিম চৌধুরী, আবুল কাশেম সন্দ্বীপ ও কাজী হাবীব উদ্দীনÑএই দশজন। এই দশজনই আমরা স্বাধীনবাংলার প্রতিষ্ঠাকর্মী। আমরা সমবেত হয়েছিলাম কালুরঘাটে এবং মুক্তিযুদ্ধের সর্বশেষ দিনটি পর্যন্ত আমরা ছিলাম। একটা ১ কিলোওয়াট ট্রান্সমিটারকে কেন্দ্র করে পটিয়া হয়ে ৩ এপ্রিল আমরা আগরতলা চলে যাই। এভাবে আগরতলা এবং ইন্ডিয়ান সরকারের সহায়তায় ২৪মে পর্যন্ত ষ্টেশন চালিয়েছি। এ সময় আমরা রেকর্ড করতাম এবং বিএসএফের লোকজন আমাদের হেল্প করে। ওই সময় আমরা বুঝতাম যে আমাদের লিসনিং এরিয়া অনেক সীমিত। ভালোভাবে কেউ শুনতে পায় না। পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। ধারাবাহিকতা অক্ষুন্ন রাখছি কিন্তু পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। এই দশজনই আমরা চালাচ্ছিলাম। একজন পরে যোগ দিল, সুব্রত বড়–য়া। তিনি ১৭ই এপ্রিল যোগ দিলেন। আগরতলার ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রীর বাড়িতে। তাঁকে পেয়ে আমরা বললাম আমাদের একটা পাওয়ারফুল ট্রান্সমিটার দরকার, তাছাড়া আমাদের পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। আমরা যে উদ্দেশ্যে আগাতে চাচ্ছি সেটার পারপাস সার্ভ হচ্ছে না। উনি উনার ভাষায় আমাদের বললেন তোমাদের মুজিবনগর সরকারকে আমরা একটা ট্রান্সমিশন দিচ্ছি তোমাদের সেটা কাজে লাগবে। ৫০ কিলোওয়াট, ওখানে আরো অনেক কর্মী এসে উপস্থিত হল। এরমধ্যে আমরা কিছু গুরুত্বপুর্ণ কাজ করেছি। তার মধ্যে একটা হলো প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের একটা বক্তৃতা, ১৭ এপ্রিল আমবাগানে যে শপথ গ্রহন হয় সেটার এবং আমাদের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম সাহেবের একটা বক্তৃতা প্রচার করি। এগুলো শোনা যায়নি কিন্তু আকাশবানী এগুলো শোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ২৫ শে মার্চ থেকে শুরু হয়কলকাতা থেকে ৫০ ওয়াট কিলোয়াটের ট্রান্সমিটার। তারপর থেকে সবাই অনুষ্ঠান শুনতে পেত।

প্রশ্ন : ওই সময়তো আপনারা ছিলেন। তারপরে যুক্ত হল কারা ?
উত্তর : ঢাকা থেকে আমাদের বেশ কয়েকজন সহকর্মী গেছেন, রাজশাহী থেকে গেছেন, সবাই মিলে আমরা একত্রিত হয়ে কাজ করেছি।

প্রশ্ন : আপনি কোন দায়িত্বে ছিলেন?
উত্তর : ওখানে আমরা চারজন ছিলাম প্রোগ্রাম অর্গানাইজার। এদের মধ্যে শামসুদ্দোহা চৌধুরী, আমি, আশফাকুর রহমান খান এবং মেজবাহউদ্দীন আর প্রোগ্রাম প্রডিউসার বেশ কয়েকজন ছিলেন। রেডিও ইঞ্জিনিয়ারের মধ্যে আমার সাথে পাঁচ জন ছিল।

প্রশ্ন : কলকাতা স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে তো অনেক কিছুই পেলাম। মানে নিউজ পেলাম, কথিকা পাঠ পেলাম, নাটিকা পেলাম সঙ্গীত পেলাম। সঙ্গীত তো একটা অনেক বড় ভূমিকা পালন করেছে। কলকাতায় যে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হল এবং কর্মকান্ড চললো ওই প্রেক্ষাপট এবং ওই সময়টা সম্পর্কে একটু বলবেন।
উত্তর : আসলে ওটা ছিল সরকারের মূখপত্র। তখন সম্পূর্ণরুপে সাধারন বেতারে যে রকম পলিসি থাকে। সেটাই আমরা করেছিলাম। আমি যে পিরিয়ডের কথা বলেছি সে সময় কোনো নীতিমালা ছিলো না। আমরা সম্পূর্ণ রুপে স্বাধীনতার জন্য কাজ করেছি। আমরা বলতাম বঙ্গবন্ধু মানে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতা মানে বঙ্গবন্ধূ। এই আমাদের ছিল আদর্শ আর কিছুই ছিল না।

প্রশ্ন : আপনি তো শেষ পর্যন্ত ছিলেন, একদম শেষ সময়ের কথা যখন বিজয় ঘনিয়ে এল, যখন সারেন্ডার করতে যাচ্ছে, সে সময়টা এবং তারপরবর্তীতে যখন বাংলাদেশ মুক্ত হলো এবং আপনি বললেন এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র যখন বন্ধ হয়ে গেল, সেই দিনটার কথা একটু বলেন।
উত্তর : এরপরে স্বাধীন বাংলা নামটি কিন্তু পরিবর্তিত হল ৬ ডিসেম্বর। তারপর ভারত যখন আমাদের স্বীকৃতি দিয়ে দিল ওখান থেকে নাম পাল্টে হয়ে গেল বাংলাদেশ বেতার। আর কোজিং সেশনে আমরা বলতাম জয় বাংলার দ্বিতীয় ভাগ। আর নভেম্বর মাসে ইন্ডিয়ান সরকার জাতীয় সংগীত হিসাবে স্বীকৃতি দিল, আমার সোনার বাংলা। আর একদম কোজিং সেশনে প্রচার করেছি Ñ আল্লাহ রাব্বুল আলামিন বলেছেন, আমরা তখনি কোন জাতিকে সাহায্য করি যখন সে জাতি নিজেকে নিজে সাহায্য করে। এটা একেবারে শেষ দিন প্রচার হয়েছিল। আর ১৬ই ডিসেম্বর বিজয়ের দিন আমরা যে বাড়িতে ছিলাম, বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডে সেই বাড়িতে সিকিউরিটি উঠে গেল আমরা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম।

প্রশ্ন : আমরা জানতে চাই একদম কোন প্রোগ্রামটা দিয়ে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রর যবনিকা পাঠ হল?

উত্তর : একদম শেষতম প্রোগ্রাম নিয়ে কেউ প্রশ্নও করে নাই, তাই বলার সুযোগও পাই নাই, শেষ প্রোগ্রাম হিসাবে আমি নিজে কোরআন পাঠ করেছি, দেখে দেখে গীতা পাঠ করেছি, ত্রিপিটক পাঠ করেছি, বাইবেল পাঠ করেছি। সবগুলো পর পর নিজের কন্ঠে পাঠ করেছি। তখন কোনো পাঠক নেই। আর স্বাভাবিক নিয়মে আমরা জয় বাংলা বলে শেষ করতাম।

প্রশ্ন : এবারে জানতে চাই আজকে স্বাধীনতার ৪০ বছর পার হলো, এই ৪০ বছরের স্বপ্ন কতটুকু পুরন হয়েছে।
উত্তর : আমি জীবনে কোনদিন কোন রাজনীতি করিনি। আমি একজন সাধারন নাগরিক হিসাবে, একজন বেতার কর্মী হিসাবে আমার অভিজ্ঞতা নিয়ে ১৯৮৬ সালে আমার একটি বই বেরিয়েছিল ‘আরেক মুক্তিযুদ্ধ’ এবং ১৯৯০ সালে আমার একটি কবিতার বই বের হয়েছিল, ‘সামনে আছে মুক্তিযুদ্ধ।’ আমরা ৯ মাসে ভৌগলিক স্বাধীনতা অর্জন করলেও কাঙ্খিত স্বাধীনতা অর্জন করতে পারি নাই। আর জনগনের যে স্বাধীনতা আর স্বাধীনতার যে মর্মকথা তার ধারে কাছেও আমরা যেতে পারি নাই। আরেকবার আমাদের নতুন প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধ করতে হবে অবিকল একই রকম মুক্তিযুদ্ধ। আগে আমরা শত্র“কে চিনতে পারতাম, এখন আমরা শত্র“কে চিনতে পারছি না। আমরাই আমাদের শত্র“। আরবীতে একটা কথা আছে নিজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। আমরা এখন যে স্বাধীনতা ভোগ করছি সেটা হচ্ছে পতাকা শোভিত স্বাধীনতা আর জাতীয় সংগীত শোভিত স্বাধীনতা। আসল স্বাধীনতা পেতে হলে আমাদের নতুন প্রজন্মকে আরেকবার মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহন করতে হবে। সেই মুক্তিযুদ্ধ হবে নিজের বিরুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধ। স্বাধীন মানে স্ব-অধীন। যতদিন পর্যন্ত নিজের অধীনে আসতে পারবো না ততদিন পর্যন্ত আমরা স্বাধীনতা ভোগ করতে পারবো না ।  

সাক্ষাৎকারটি উকিপিডিয়ার মাধ্যমে mediavibrationbd.com,এর সৌজন্যে ২৮-১১-২০১২ প্রকাশিত হয় । আজ তাঁর স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নিবেদন করা হলো -বাংলার প্রান্তর

No comments: