মায়ের বুকেই ছেলের কবর
হাসান আরিফ , সাধারণ সম্পাদক, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট
হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুকে ঘিরে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সংঘটিত রূপের একটা মহড়া হয়ে গেল। পরিবারের মত পেলে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট দেশের সকল বরেণ্য মানুষকে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে যেতে চাই।
কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার আমাদের মুক্তি সংগ্রামের উন্মেষ লগ্নে ভাষার অধিকার পাবার স্মারক। তাই এ দেশ ও জাতি এগিয়ে যেতে, যে মানুষেরা অবদান রেখেছেন সেই পুণ্যভূমিতে দাঁড়িয়েই জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের প্রতি আমরা শ্রদ্ধায় অবনত হই। হুমায়ূন আহমেদ দেশপ্রেমিক হিসেবে আমাদের সব শর্ত পূরণ করেন। তাই আমরা তার প্রয়াণের সংবাদ পাবার পরপরই শহীদ মিনারে তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাবার মানসিক প্রস্তুতি গ্রহণ করি। অপেক্ষা পরিবারের সম্মতি পাবার, তা মিলে গেল। সংগত কারণেই আমাদের প্রত্যাশা ও পরিবারের মতের কোনো অমিল ঘটল না।
(মরদেহ শহীদ মিনারে নির্ধারিত স্থানে রাখা হলো। শোকার্ত সন্তান ও ভাই বোনেরা কফিনের পেছনে দাঁড়ালেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মানুষের ভালোবাসার শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করার জন্য। মাইকে যত দূর সম্ভব হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকলের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর হুমায়ূন আহমেদের মা এসে ছেলের কফিন আঁকড়ে দাঁড়ালেন)
এই প্রথমবারের মতো শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব কীভাবে সম্পন্ন হবে, তা নিয়ে আমরা গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম। এই ভাবনার কারণগুলো হচ্ছেÑ
১. সঠিক সময়ে হুমায়ূন আহমেদের মরদেহ ঢাকায় পৌঁছাবে কি না
২. বিমানবন্দর থেকে শহীদ মিনার পৌঁছানোটা নির্বিঘœ হবে কি না
৩. শহীদ মিনারে কত মানুষ হবে
৪. সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন মাধ্যম, সংবাদপত্র সর্বস্তরের মানুষ সবাইকে সমান প্রাধান্য দিয়ে সবার প্রিয় মানুষটির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন নিশ্চিত করা
৫. শ্রাবণ মাস বৃষ্টি হতেই পারে, তা যেন শ্রদ্ধা নিবেদন স্বাভাবিকতা ও স্বাবলীলতা ক্ষুণœ না করে।
এ নিয়ে ২০ জুলাই থেকে জোট নেতৃবৃন্দ, পরিবারের সদস্য ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত কথা বলে চলেছি। চূড়ান্তভাবে ২২ জুলাই সকালবেলায় সংশ্লিষ্ট সবাই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে একটি সমন্বিত সভায় মিলিত হলাম।
শহীদ মিনারে একুশে ফেব্র“য়ারিকে কেন্দ্র করে যে রকম নিরাপত্তাবেষ্টনী ব্যবস্থা করা হয়, অনেকটা সেই আদলেই বিষয়টা ভাবা হলো, ব্যতিক্রম শুধু শহীদ মিনারে প্রবেশ ও বেরিয়ে যাওয়ার বিষয়টি। স্থির করা হলো দোয়েল চত্বরের দিক থেকে এসে সকলে প্রবেশ করবে এবং জগন্নাথ হলের দিক দিয়ে বেরিয়ে যাবে।
সকাল থেকেই পরিকল্পনা অনুযায়ী বেষ্টনীর কাজ শুরু হলো। দিনশেষে সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য মনে হলো। সকল সরকারি বেসরকারি টেলিভিশনের কলাকুশলী, সংবাদপত্রের আলোকচিত্র সাংবাদিকÑ সকলে শহীদ মিনারে উপস্থিত। কাল হুমায়ূন আহমেদের শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব কীভাবে সম্প্রচার করা হবে, তারই আয়োজন হচ্ছে। নানা যন্ত্রপাতি আসছে। টেবিলে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলের নাম লিখে জায়গা নির্ধারণ করে রাখার চেষ্টা আর ফটোসাংবাদিকেরাও দেখে নিচ্ছেন তাদের ব্যবস্থা কী হলো। আর সব ব্যস্ততার মাঝে একে অপরের সঙ্গে একটি বিষয় নিয়ে মতপ্রকাশ ও ভাবনাÑ শহীদ মিনারে কত লোক হবে।
ঘড়ির কাঁটা রাত ১২টা অতিক্রম করার পর যখন শহীদ মিনার ত্যাগ করছি পেছনের ফিরে শহীদ মিনারের দিকে তাকিয়ে মনে হলো, গণমাধ্যমের হাট বসেছে শহীদ মিনার চত্বরে। সকলের সেই কৌতূহলটা মাথা থেকে কোনোভাবেই বের করতে পারছি না, কাল শহীদ মিনারে কত লোক হবে?
সাংস্কৃতিক কর্মীদের ভোর ছয়টায় শহীদ মিনারে প্রবেশ করবার কথা, তখনই স্ব-স্ব কাজ বুঝিয়ে দেওয়া হবে এবং নির্ধারিত স্বেচ্ছাসেবক ব্যাজ প্রদান করা হবে।
ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর ছটা স্পর্শ করেছে। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছি এমন সময় মঞ্জুর ফোন, ‘বেশ ক’টি টেলিভিশন ক্যামেরা নির্ধারিত স্থানের বাইরে এসে স্থান নেওয়ার চেষ্টা করছে কী করব?’ আমি বললাম, সকলেই জানে, কার জন্য কোন জায়গা নির্ধারিত, তুমি বিষয়টি স্মরণ করিয়ে অনুরোধ করো, নিশ্চয়ই তারা সরে যাবে। অল্প সময়ের মধ্যে আমি শহীদ মিনারে পৌঁছে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা সর্বাÍকভাবে প্রস্তুত, তবে সবাইকে নির্ধারিত স্থানে রাখতে জোট কর্মীদের খুব বেগ হচ্ছিল। তখনই লালনের একটা গান মনে এসেছিল,
‘চিরদিন ইচ্ছা মনের
আল ডিঙ্গাইয়া ঘাষ খাবা
মন সহজেই সই হবো।’
১১টায় হুমায়ূন আহমেদের শবদেহ আসবে। হঠাৎ সাড়ে ৯টায় বলা হলো ১০টার মধ্যেই তার মরদেহ শহীদ মিনারে আসবে। আমরা প্রস্তুত। ইতোমধ্যে প্রবেশস্থলেই প্রচুর লোক সমাগম ঘটেছে। শহীদ মিনার থেকে বেরোতে পারছি না বলে সবটা দৃষ্টিগোচরে আনা সম্ভব নয়।
মরদেহ শহীদ মিনারে নির্ধারিত স্থানে রাখা হলো। শোকার্ত সন্তান ও ভাই বোনেরা কফিনের পেছনে দাঁড়ালেন। হুমায়ূন আহমেদের প্রতি মানুষের ভালোবাসার শ্রদ্ধার পুষ্পাঞ্জলি গ্রহণ করার জন্য। মাইকে যত দূর সম্ভব হুমায়ূন আহমেদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য সকলের নাম ঘোষণা করা হচ্ছিল।
কিছুক্ষণ পর হুমায়ূন আহমেদের মা এসে ছেলের কফিন আঁকড়ে দাঁড়ালেন। শহীদ মিনারে দেশের কত কৃতী সন্তানদের শেষ শ্রদ্ধা জানানো হলো, চৌষট্টি বছরের মৃত সন্তানকে আঁকড়ে আছেন শুভ্র সারির এক বর্ষীয়ান মা। দেখে মনে হয় তার চোখ থেকে পুত্র শোকের অশ্র“ নয়, যেন এক অনন্য নদী প্রবাহিত হচ্ছে। একদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য যিনি তার জীবনসঙ্গীকে হারিয়ে সন্তানদের বুকে জড়িয়ে রেখেছিলেন, স্বাধীন দেশে এই শহীদ সন্তানদের তিনিই ছিলেন প্রগাঢ় ছায়া। আজ তার বড় সন্তান নিশ্চুপ নিথর হয়ে আছে। তাকে ঘিরে হাজারো মানুষ শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর মাতম। তার সন্তানেরা স্বাধীনতার চার দশকে কৃতী মানুষ হয়েছেন এমনকি দৌহিত্ররা ও অনেকেই প্রতিষ্ঠিত। সবাই তার পাশে তবু তিনি যেন কারও সঙ্গে সন্তান হারানোর শোক ভাগ করে নিতে ব্যর্থ।
একসময় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদনের সময় শেষ হয়ে গেল। পুষ্পস্নাত হুমায়ূন আহমেদকে জানাজার জন্য নিয়ে যাওয়া হলো জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে। প্রয়াত ছেলের মুখ দেখে তবেই বাড়ি যাবেন আজ। জানাজা শেষে ছেলে মেয়ে নাতি-নাতনিদের নিয়ে যাবেন বারডেম হাসপাতালে, সেই মতো তিনিও গেলেন।
শক্ত শর্তজুড়ে প্রিয় সন্তানের নিথর নিশ্চল নিশ্চুপ মুখ দর্শন করলেন। হু হু করে কেঁদে উঠলেন। শর্ত পালনের ফলে মৃত সন্তানের মুখ দর্শনের শোক সংবাদ হয়ে ওঠার সুযোগ হয়ে উঠল না। অথবা ভিন্নভাবে বলি, মা তার প্রিয় সন্তানের জন্য হাহাকারকে দেশের করতে দিলেন না।
তবু আমরা অপারগ হলাম বুঝতে, মানুষের একান্ত বলে কিছু থাকে। যেমন ধর্ম বলে ‘মায়ের পায়ের নিচে
সন্তানের বেহেস্ত’। ফলে মা কি তার ছেলেকে হারায় কোনো দিন?
তবু জগৎ সংসারে এমনটাও ঘটে শত কোলাহলে। আমরা মায়ের মতো জানতে ভুলে যাই, ভুলে যাই মৃত্যুসংবাদ শোনার সঙ্গে সঙ্গেই মায়ের বুকে সন্তানের কবর রচিত হয়ে যায়।
কোলাহল থেমে গেলে মা যখন বলেন, ‘ছেলের কবর তো আমার বুকেই।’
লজ্জায় বোধসম্পন্ন মানুষদের মাথা নিচু হয়ে যায়। আমরা তো সেই জাতি, যারা মা ও মাতৃভূমিকে সমার্থক বলে জানি। সংশয় কাটে না, আমরা কি মায়ের প্রতি কোনো অবহেলা করে ফেললাম।
Posted on August 8, 2012
Shapthaik Kagoj

No comments:
Post a Comment